ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নির্বাচনকালীন সরকার

পঞ্চদশ সংশোধনী কি সত্যিই সাংবিধানিক?

পঞ্চদশ সংশোধনী কি সত্যিই সাংবিধানিক?
×

২১ জুন ২০২৩ ঢাকার একটি হোটেলে পঞ্চদশ সংশোধনীবিষয়ক সেমিনার - ফাইল ফটো

ইকতেদার আহমেদ

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৩ | ১৮:০০

বিএনপি এবং অন্যান্য গণতন্ত্রকামী রাজনৈতিক দল নির্বাচনকালীন ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ (এনসিজি) পুনর্বহালসহ ‘১০ দফা জনদাবি’ আদায়ে ব্যাপক গণআন্দোলনে রয়েছে। কিন্তু সরকার অনড় এ যুক্তিতে যে, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইতোমধ্যে সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে বিলুপ্ত করা হয়েছে। যেহেতু এটা আর বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে নেই, সুতরাং এনসিজির পুনঃপ্রবর্তন বেআইনি এবং অসাংবিধানিক হবে। প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগ কোন সংবিধানের কথা বলছে? এ সংবিধান কি সত্যিই জনগণের ইচ্ছার প্রতিনিধিত্ব করে?

 ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকার সংবিধানের ১৩তম সংশোধনী প্রণয়ন করে এবং জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রবর্তন করে। মূলত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবিতে এর আগে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ভয়াবহ অগ্নিসংযোগ ও ব্যাপক ধ্বংসাত্মক আন্দোলন চালায় এবং ১৭৩ দিনের মতো হরতাল পালন করে। বহু প্রাণ ঝরেছিল সে সময়। বলা হয়েছিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পরিবর্তে দলীয় নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে নির্বাচন জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য নয়। ১৩তম সংশোধনীটি ছিল প্রকৃতপক্ষে প্রধান রাজনৈতিক দলসহ সব অংশীজনের মধ্যে ‘জাতীয় ঐকমত্যের’ মাধ্যমে একটি ‘রাজনৈতিক মীমাংসার’ ফসল। এটি শুধু শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরকে সহজতরই করেনি, বরং সব রাজনৈতিক দল এবং অন্যান্য প্রতিযোগীকে সমান সুযোগ দিয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল নাগরিকদের ভোটাধিকার, গণতান্ত্রিক অনুশীলন নিশ্চিত ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত পরবর্তী কয়েকটি নির্বাচন দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্য হয়েছিল এবং দেশে অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।

২০১১ সালের ৩০ জুন ক্ষমতাসীন সরকার আশ্চর্যজনকভাবে সুপ্রিম কোর্টের রায়কে উল্লেখ করে একতরফাভাবে ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে এনসিজি বাতিল করে। ফলে ক্ষমতাসীন দল এবং একই প্রধানমন্ত্রীর অধীনে পরবর্তী দুটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যা ছিল নির্বাচনের নামে প্রহসন। পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে এবং হচ্ছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার একতরফা বিলুপ্তি ১৯৯৬ সালের ‘রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ তছনছ করে দেয়। ফলে চলমান সংসদকে অক্ষুণ্ন রেখেই ক্ষমতাসীন দলের অধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান প্রবর্তিত হয়। একেই আজকের ভয়াবহ রাজনৈতিক পরিস্থিতির মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। এটি জনপ্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচার বিভাগসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের রাজনীতিকীকরণের পথ প্রশস্ত করে। ফলে আইনের শাসন ও নির্বাচনী ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালে দুটি সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়। দুটি নির্বাচনই অনুষ্ঠিত হয়েছিল জনগণের কোনো প্রকার অংশগ্রহণ ছাড়া। জাতি আরেকটি ব্যর্থ দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন দেখতে চায় না।

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ইচ্ছাকৃত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিচারিক রায়ের ভুল ব্যাখ্যা করে জাতিকে বিভ্রান্ত করেছে যে, সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন। সে কারণে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার উল্লেখ করেনি, সুপ্রিম কোর্ট এটাও বলেছেন, পরবর্তী দুটি নির্বাচন হবে বিরাজমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। তবে বিচারপতিদের বাদ দিয়ে। এভাবে আওয়ামী লীগ জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছে এবং পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বিভ্রান্তিকর উপায়ে বাতিল করেছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি রাজনৈতিক মীমাংসা হিসেবে সংসদে পাস হয়েছিল। উল্লেখ্য, বিচারপতি খায়রুল হক একজন সিনিয়রকে টপকিয়ে শাসকগোষ্ঠীর আনুকূল্যে প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হয়েছিলেন। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে দেওয়া হাইকোর্টের রায়ের বিপক্ষে আপিল দায়েরের ছয় বছর পরে এটি পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন এবং তড়িঘড়ি করে ‘সংক্ষিপ্ত আদেশ’ ঘোষণা করেছিলেন, তাও আবার তাঁর অবসরে যাওয়ার মাত্র ৮ দিন আগে। মাত্র ১০ দিনের শুনানিতে এবং অ্যামিকাস কিউরির সুচিন্তিত পরামর্শ ও সুপারিশ উপেক্ষা করে রায় দেওয়া হয়েছিল।

১৫তম সংশোধনী বিশেষ সংসদীয় কমিটির সুপারিশ উপেক্ষা করেছে। সংসদের উপনেতা সাজেদা চৌধুরীকে চেয়ারম্যান এবং সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে ভাইস চেয়ারম্যান করে ২০১০ সালের ২১ জুলাই উচ্চতর বিচার বিভাগের রায়ের আলোকে সংবিধান সংশোধনের জন্য ১৫ সদস্যের একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়। উল্লেখ্য, এর আগে উচ্চ আদালত পঞ্চম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করেন। এ কমিটিতে ১২ জন ছিলেন আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা এবং বাকি তিনজন ১৪ দলীয় জোটের। ইতোমধ্যে ২০১১ সালের ১০ মে সুপ্রিম কোর্ট একটি বিভক্ত রায় এবং সংক্ষিপ্ত আদেশে ১৩তম সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করেন। তবে সর্বসম্মতিক্রমে আদেশ দেন– পরবর্তী দুটি নির্বাচন বিদ্যমান নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত হবে এবং এটি গঠিত হবে বিচারপতিদের বাদ দিয়ে। উল্লেখ্য, একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, তিনজন সাবেক প্রধান বিচারপতি, সিনিয়র রাজনৈতিক নেতা, সম্পাদক ও সুশীল সমাজের সদস্যসহ ১০৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির সুপারিশের ভিত্তিতে বিশেষ কমিটি ২০১১-এর ২৯ মে তিন মাস মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রেখে সংবিধান সংশোধনের সুপারিশ করে।

পরদিন অর্থাৎ ৩০ মে কমিটির সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন এবং এর পক্ষে প্রদত্ত কমিটির সুপারিশ নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়। কমিটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কোনো বিধান না রেখেই সাংবিধানিক সংস্কারের প্রস্তাব করে। ক্ষমতাসীন দলের অধীনে চলমান সংসদকে বলবৎ রেখেই নির্বাচন করার প্রস্তাব দেয়। এটা স্পষ্ট, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় চুরির উদ্দেশ্যে বিশেষ সংসদীয় কমিটি কর্তৃক গৃহীত নাগরিক অনুশীলনটি রাতারাতি প্রত্যাখ্যান করা হয়।

৩০ জুন ২০১১, আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার প্রায় ১৬ মাস আগে, বর্তমান সরকার চলমান বাজেট অধিবেশনে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দম্ভে ২৯৫:১ ভোটে সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সংবিধান থেকে সরিয়ে দেয়। আশ্চর্যজনকভাবে, আপিল বিভাগের রায়ের রেফারেন্স টেনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। যদি আদালতের ‘সংক্ষিপ্ত আদেশ’-এর রেফারেন্স টানা হয়, তবে তা সত্য নয় এবং যদি লিখিত রায়ের রেফারেন্স টানা হয়, তবে তো সেটি তখনও দিনের আলো দেখেনি।

সংবিধানের ১৫তম সংশোধনী জাতির সঙ্গে প্রতারণা। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পরবর্তী দুটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের সেই নির্দেশ আওয়ামী লীগ পালন না করে উল্টো তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করেছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ/পর্যবেক্ষণ মেনে চলার সাংবিধানিক রীতিকে উপেক্ষা করে ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে দুটি জাতীয় নির্বাচন হয়েছে। অথচ সুপ্রিম কোর্ট আমাদের সংবিধানের অভিভাবক। ২০১৪ ও ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচন শুধু নাগরিকদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করেনি, এ নির্বাচন দেশ-বিদেশে একটি ‘জাতীয় কলঙ্ক’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। গণতন্ত্রপন্থি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বর্তমান বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শৃঙ্খলা ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের অনুপস্থিতিতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করছে।

১৯৯৬ সালে বিএনপি জাতীয় ঐকমত্যকে সম্মান জানিয়ে যেভাবে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে জাতীয় সংসদে আইন পাস করে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা’ প্রবর্তন করেছিল, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারও জনগণের চলমান দাবির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে জাতীয় ঐকমত্য ও একটি নতুন রাজনৈতিক মীমাংসার ভিত্তিতে এবং সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুসারে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের যুক্ত না করে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা’ পুনরুজ্জীবিত করতে পারে।

(২১ জুন ২০২৩ তারিখে সেমিনারে উপস্থাপিত প্রবন্ধের সংক্ষিপ্ত রূপ) 

ইকতেদার আহমেদ: সাবেক জজ ও সুপ্রিম কোর্টের সাবেক রেজিস্ট্রার জেনারেল

আরও পড়ুন

×